ঢাকায় একটি ফ্ল্যাট কেনা অনেক পরিবারের জীবনের সবচেয়ে বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত। বিজ্ঞাপনের ছবি, মডেল ফ্ল্যাট বা বিক্রেতার কথায় ভরসা করে তাড়াহুড়ো করলে পরে বড় ধরনের ঝামেলায় পড়তে হতে পারে: কাগজপত্রে জটিলতা, হস্তান্তরে দেরি, কিংবা প্রতিশ্রুত সুবিধা না পাওয়া। তাই টাকা দেওয়ার আগে কিছু বিষয় নিজে যাচাই করে নেওয়া জরুরি।

নিচে এমন ১০টি বিষয় তুলে ধরা হলো, যা প্রায় প্রতিটি ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রেই কাজে লাগবে।

১. লোকেশন ও প্রতিদিনের যাতায়াত

ফ্ল্যাটের দাম যতই আকর্ষণীয় হোক, লোকেশন ঠিক না হলে প্রতিদিনের জীবন কষ্টকর হয়ে ওঠে। অফিস, সন্তানের স্কুল, হাসপাতাল ও বাজার কত দূরে, তা দেখুন। সকাল ও সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়ে একবার নিজে যাতায়াত করে দেখলে যানজটের প্রকৃত চিত্র বোঝা যায়।

এ ছাড়া খোঁজ নিন:

  • বর্ষায় এলাকায় পানি জমে কিনা
  • ভবনের সামনের রাস্তা কতটা প্রশস্ত, গাড়ি বা অ্যাম্বুলেন্স ঢুকতে পারে কিনা
  • আশেপাশে কারখানা, বড় বাজার বা অন্য কোনো শব্দ ও দূষণের উৎস আছে কিনা

২. মোট বাজেট, শুধু ফ্ল্যাটের দাম নয়

অনেকে শুধু ফ্ল্যাটের দাম হিসাব করেন, কিন্তু আসল খরচ এর চেয়ে বেশি। রেজিস্ট্রেশন ও সংশ্লিষ্ট কর, পার্কিং, ইউটিলিটি সংযোগ, ইন্টেরিয়র, আসবাব ও প্রতি মাসের সার্ভিস চার্জ: সবকিছু যোগ করে মোট বাজেট ঠিক করুন। রেজিস্ট্রেশন খরচ ও করের হার সময়ে সময়ে বদলায়, তাই কেনার সময়ের হালনাগাদ হার সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস বা আইনজীবীর কাছ থেকে জেনে নিন।

ব্যাংক ঋণ নিলে মাসিক কিস্তি আপনার আয়ের সঙ্গে মানানসই কিনা, তাও আগে থেকে হিসাব করুন।

৩. ডেভেলপারের অতীত রেকর্ড

নির্মাণাধীন প্রকল্প হলে ডেভেলপার কোম্পানির আগের প্রকল্পগুলো দেখুন। সেগুলো সময়মতো হস্তান্তর হয়েছিল কিনা, এবং সেখানকার বাসিন্দারা নির্মাণমান নিয়ে সন্তুষ্ট কিনা, সম্ভব হলে সরাসরি কথা বলে জানুন। কোম্পানির ঠিকানা, ট্রেড লাইসেন্স ও পেশাদার সংগঠনের সদস্যপদ থাকলে তা যাচাই করুন।

৪. অনুমোদিত নকশা

ভবনের নকশা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত কিনা দেখুন। ঢাকার বেশিরভাগ এলাকায় এই অনুমোদন দেয় রাজউক। অনুমোদিত নকশায় যত তলা ও যে ব্যবহারের কথা আছে, বাস্তবে তার চেয়ে বেশি তলা বা ভিন্ন ব্যবহার হলে ভবিষ্যতে সমস্যা হতে পারে। নকশার অনুমোদনপত্রের কপি চেয়ে নিন এবং প্রয়োজনে কর্তৃপক্ষের অফিস থেকে তা যাচাই করুন।

৫. জমি ও মালিকানার কাগজপত্র

ফ্ল্যাট যে জমির ওপর তৈরি, সেই জমির মালিকানা পরিষ্কার না হলে আপনার ফ্ল্যাটের মালিকানাও ঝুঁকিতে পড়ে। জমির দলিল, খতিয়ান, নামজারি, হালনাগাদ খাজনার রসিদ এবং জমির মালিক ও ডেভেলপারের মধ্যকার চুক্তি দেখুন। এই বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের আলাদা একটি লেখা আছে: ফ্ল্যাট কেনার সময় কোন কাগজপত্র যাচাই করবেন।

৬. ফ্ল্যাটের প্রকৃত আয়তন

বিজ্ঞাপনে যে আয়তন বলা হয়, তাতে প্রায়ই সিঁড়ি, লিফট লবি ও অন্যান্য কমন স্পেসের ভাগ যুক্ত থাকে। আপনি ঘরের ভেতরে আসলে কতটা জায়গা পাবেন, তা জানতে চুক্তিতে মোট আয়তন ও ব্যবহারযোগ্য আয়তন আলাদা করে লেখা আছে কিনা দেখুন। সম্ভব হলে ফিতা দিয়ে কয়েকটি ঘর মেপে নিন।

৭. নির্মাণমান ও কাঠামো

রেডি ফ্ল্যাট হলে দেয়ালে ফাটল, ছাদ বা বাথরুমে স্যাঁতসেঁতে দাগ, জানালা-দরজার মান এবং বৈদ্যুতিক ওয়্যারিং ভালোভাবে দেখুন। নির্মাণাধীন ভবনে কোন মানের রড, সিমেন্ট ও ফিটিংস ব্যবহার হবে, তা চুক্তিতে স্পষ্ট করে লিখিয়ে নিন। প্রয়োজনে একজন অভিজ্ঞ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারকে সঙ্গে নিয়ে পরিদর্শন করুন।

৮. ইউটিলিটি ও সুবিধা

গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ আছে কিনা বা কবে পাওয়া যাবে, তা লিখিতভাবে জেনে নিন। নতুন ভবনে পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগ পাওয়া সবসময় নিশ্চিত নয়, তাই সিলিন্ডার ব্যবহারের প্রস্তুতিও বিবেচনা করুন। লিফট, জেনারেটর, পানির রিজার্ভার, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়েও প্রশ্ন করুন।

৯. পার্কিং ও কমন স্পেস

গাড়ির পার্কিং ফ্ল্যাটের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত কিনা, নাকি আলাদা দামে কিনতে হবে, তা পরিষ্কার করুন। ছাদ, কমিউনিটি স্পেস ও অন্যান্য কমন এলাকা কারা ব্যবহার করবেন এবং রক্ষণাবেক্ষণের খরচ কীভাবে ভাগ হবে, তাও জেনে নিন।

১০. চুক্তি, পেমেন্ট ও হস্তান্তরের সময়সূচি

বায়না বা বিক্রয় চুক্তিতে মোট দাম, কিস্তির সময়সূচি, হস্তান্তরের তারিখ, দেরি হলে কী হবে এবং কোন কোন সুবিধা দেওয়া হবে, সব লিখিত থাকা দরকার। প্রতিটি পেমেন্টের রসিদ সংরক্ষণ করুন এবং সম্ভব হলে নগদের বদলে ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন করুন। চুক্তিতে সই করার আগে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীকে দিয়ে পড়িয়ে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

এক নজরে চেকলিস্ট

বিষয় যাচাই করেছেন?
লোকেশন, যাতায়াত ও জলাবদ্ধতা ☐
মোট বাজেট ও মাসিক খরচ ☐
ডেভেলপারের অতীত প্রকল্প ☐
অনুমোদিত নকশা ☐
জমি ও মালিকানার কাগজপত্র ☐
প্রকৃত আয়তন ☐
নির্মাণমান ☐
গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ ও লিফট ☐
পার্কিং ও কমন স্পেস ☐
লিখিত চুক্তি ও পেমেন্টের রসিদ ☐

শেষ কথা

ফ্ল্যাট কেনার সিদ্ধান্তে আবেগের চেয়ে যাচাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ওপরের বিষয়গুলো ধাপে ধাপে দেখে নিলে অনেক অপ্রত্যাশিত ঝামেলা এড়ানো যায়। মনে রাখবেন, এই লেখাটি সাধারণ নির্দেশনা; কাগজপত্র ও চুক্তির আইনি দিক নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

Orvix Real Estate-এর সঙ্গে খুঁজুন: ঢাকায় বিক্রির জন্য ফ্ল্যাট দেখতে আমাদের Buy Property পাতা ঘুরে দেখুন। পছন্দের ফ্ল্যাটের পাতা থেকেই ভিজিটের অনুরোধ পাঠাতে পারেন, অথবা যেকোনো প্রশ্নে যোগাযোগ করুন।