বাসা ভাড়ার ব্যাপারে বেশিরভাগ বিরোধ শুরু হয় একটি সাধারণ কারণে: কথা হয়েছিল মুখে, কিন্তু লেখা হয়নি। ভাড়া কবে বাড়বে, অগ্রিম কীভাবে ফেরত আসবে, কে মেরামত করবে, বাসা ছাড়তে কত দিন আগে জানাতে হবে: এসব নিয়ে দুই পক্ষের স্মৃতি আলাদা হয়ে যায়। একটি পরিষ্কার লিখিত চুক্তি বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়া দুজনকেই সুরক্ষা দেয়।

এই লেখায় ভাড়ার চুক্তিতে কোন কোন শর্ত লিখে রাখা উচিত, তা ধাপে ধাপে দেওয়া হলো। এটি সাধারণ নির্দেশনা; চুক্তির আইনি রূপ চূড়ান্ত করার আগে একজন আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া ভালো।

১. দুই পক্ষ ও বাসার পরিচয়

চুক্তির শুরুতেই বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার পূর্ণ নাম, বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ও ফোন নম্বর লিখুন। বাসার সুনির্দিষ্ট ঠিকানা, তলা, ফ্ল্যাট নম্বর ও কী কী কক্ষ ও সুবিধাসহ ভাড়া দেওয়া হচ্ছে, তা উল্লেখ করুন। মালিক নিজে না থাকলে যিনি স্বাক্ষর করছেন, তাঁর ক্ষমতার প্রমাণও রাখুন।

২. ভাড়া ও পরিশোধের নিয়ম

  • মাসিক ভাড়ার পরিমাণ
  • কোন তারিখের মধ্যে দিতে হবে
  • কোন মাধ্যমে দেওয়া হবে (নগদ, ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিং)
  • রসিদ বা প্রাপ্তিস্বীকার দেওয়ার নিয়ম
  • দেরি হলে কী হবে, কোনো জরিমানা থাকলে তার পরিমাণ

পরিশোধের নিয়ম অস্পষ্ট থাকলে "দিয়েছি" আর "পাইনি" নিয়ে বিরোধ হয়। তাই প্রতি মাসের ভাড়ার প্রমাণ রাখুন।

৩. অগ্রিম বা জামানতের শর্ত

অগ্রিম কত মাসের, কোন তারিখে দেওয়া হলো এবং এটি কীভাবে সমন্বয় হবে: শেষ কয়েক মাসের ভাড়া থেকে কাটা হবে নাকি বাসা ছাড়ার সময় ফেরত দেওয়া হবে, তা পরিষ্কার লিখুন। কোন ক্ষেত্রে অগ্রিম থেকে টাকা কাটা যাবে (যেমন নির্দিষ্ট ক্ষতি বা বকেয়া বিল) এবং কত দিনের মধ্যে ফেরত দেওয়া হবে, তাও উল্লেখ করুন।

৪. চুক্তির মেয়াদ ও ভাড়া বাড়ানোর নিয়ম

চুক্তি কত মাস বা বছরের জন্য এবং শেষে নবায়ন কীভাবে হবে, তা লিখুন। ভাড়া বাড়ানোর শর্ত থাকলে স্পষ্ট করুন: কত শতাংশ বা কত টাকা, কত বছর পর এবং কত দিন আগে জানাতে হবে। "বছরে একবার বাড়বে" জাতীয় অস্পষ্ট কথার বদলে সংখ্যা ও সময় নির্দিষ্ট করুন।

৫. কোন খরচ কে দেবে

ভাড়ার সঙ্গে কোন খরচ যুক্ত আর কোনটি আলাদা, তার তালিকা করুন:

  • সার্ভিস চার্জ
  • বিদ্যুৎ বিল ও মিটারের ধরন
  • গ্যাস, পানি ও ইন্টারনেট
  • পার্কিং ও জেনারেটরের খরচ
  • ময়লা ও পরিচ্ছন্নতার চার্জ

ভাড়া বাড়ানো ছাড়া অন্য কোনো খরচ বাড়ানো যাবে কি না, সেটিও লিখে রাখুন।

৬. মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ

ছোটখাটো মেরামত (যেমন বাতি, কলের ওয়াশার) ভাড়াটিয়া করবেন কি না এবং বড় মেরামত (যেমন ছাদ, দেয়াল, পাইপ) বাড়িওয়ালা করবেন কি না, তা লিখুন। কোনো সমস্যা হলে কাকে কীভাবে জানাতে হবে এবং কত দিনের মধ্যে ঠিক করার চেষ্টা করা হবে, তাও ঠিক করুন।

৭. ব্যবহারের নিয়ম

বাসাটি শুধু বসবাসের জন্য, নাকি ব্যবসার কাজেও ব্যবহার করা যাবে; কতজন থাকবেন; অতিথি, পোষা প্রাণী, ভাড়াটিয়া অন্যকে সাবলেট দিতে পারবেন কি না; ভবনের নিয়মকানুন মানার শর্ত: এগুলো লিখুন। নিয়ম জানা না থাকলে ভবনের ম্যানেজার বা সমিতির কাছ থেকে আগে জেনে নিন।

৮. বাসা ছাড়া ও চুক্তি বাতিলের শর্ত

কোনো পক্ষ বাসা ছাড়তে বা ছাড়তে বলতে চাইলে কত দিন আগে লিখিতভাবে জানাতে হবে, তা ঠিক করুন। কোন পরিস্থিতিতে বাড়িওয়ালা চুক্তি বাতিল করতে পারবেন (যেমন ক্রমাগত ভাড়া না দেওয়া), তা স্পষ্ট করুন। বাসা ছাড়ার দিনে একসঙ্গে বাসা দেখে বুঝে নেওয়ার নিয়মও রাখুন।

৯. বাসার অবস্থার তালিকা সংযুক্ত করুন

ওঠার দিনে বাসার অবস্থা, আসবাব ও ফিটিংসের একটি তালিকা এবং ছবি চুক্তির সঙ্গে যুক্ত করুন, দুই পক্ষের স্বাক্ষরসহ। কীভাবে তৈরি করবেন, জানতে পড়ুন ফ্ল্যাট হস্তান্তরের সময় মালিক ও ভাড়াটিয়ার তালিকা।

১০. স্বাক্ষর, সাক্ষী ও কপি

দুই পক্ষ প্রতিটি পাতায় স্বাক্ষর করুন, প্রয়োজনে সাক্ষীসহ। প্রত্যেকে একটি করে মূল কপি রাখুন। বাংলাদেশে বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১ বলবৎ আছে। আপনার চুক্তি কীভাবে সাজাবেন বা স্ট্যাম্প ও নিবন্ধনের প্রয়োজন আছে কি না, তা আইনজীবীর কাছ থেকে জেনে নিন।

ভাড়া চুক্তির চূড়ান্ত তালিকা

বিষয় ঠিক আছে?
দুই পক্ষ ও বাসার পরিচয় লেখা ☐
ভাড়া ও পরিশোধের নিয়ম লেখা ☐
অগ্রিম ও ফেরতের শর্ত লেখা ☐
মেয়াদ ও ভাড়া বাড়ানোর নিয়ম লেখা ☐
কোন খরচ কে দেবে লেখা ☐
মেরামতের দায়িত্ব লেখা ☐
ব্যবহারের নিয়ম লেখা ☐
বাসা ছাড়ার নোটিশের নিয়ম লেখা ☐
বাসার অবস্থার তালিকা যুক্ত ☐
স্বাক্ষর ও কপি সংরক্ষিত ☐

শেষ কথা

একটি ভালো চুক্তি সম্পর্ক নষ্ট করার জন্য নয়, বরং ভবিষ্যতের ভুল বোঝাবুঝি এড়ানোর জন্য। সবকিছু লিখে রাখলে দুই পক্ষই নিশ্চিন্তে থাকতে পারে। ভাড়া নেওয়ার আগে আর কী যাচাই করবেন, জানতে পড়ুন ফ্ল্যাট ভাড়া নেওয়ার আগে ভাড়াটিয়ার যে বিষয়গুলো জানা দরকার।

Orvix Real Estate-এর সঙ্গে: ভাড়ার বাসা খুঁজতে দেখুন আমাদের Rent Property পাতা, অথবা প্রশ্ন থাকলে যোগাযোগ করুন।